আরাফাহ দিবস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় দিন। ইসলামিক চন্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে এই পবিত্র দিনটি পালিত হয়। এটি এমন একটি দিন, যখন মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন, গুনাহ মাফ করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা এই আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। যারা হজ পালন করছেন না, তাদের জন্যও এই দিনের বিশেষ আমল ও ফযীলত রয়েছে। বিশেষ করে, আরাফাহ দিবসের দোয়া আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। এই নিবন্ধে আমরা আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব, এর ফযীলত এবং দোয়া কবুলের আদব ও আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
আরাফাহ দিবস ইসলামের পরিপূর্ণতা লাভের দিবস হিসেবে পরিচিত। এই দিনে মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আরাফাতের ময়দানে মুসলিম হজযাত্রীরা একত্রিত হন। এই ময়দানেই রয়েছে ‘রহমতের পর্বত’ (জাবাল আর-রহমাহ), যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ হজের সময় মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী খুতবা দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আরাফাহ দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। কিছু মুসলিম মনে করেন যে, এই দিনেই কুরআনুল কারীমের সেই আয়াত নাজিল হয়েছিল যেখানে ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আয়াতটি হলো: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩)
এই দিনটি তওবা ও দোয়া কবুলের দিন হিসেবেও বিশেষভাবে পরিচিত। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, “সবচেয়ে উত্তম দোয়া হলো আরাফাহ দিবসের দোয়া।” তাই এই দিনে মুসলিমরা আল্লাহর কাছে নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য দোয়া করেন।
আরাফাহ দিবসের ফযীলতসমূহ
আরাফাহ দিবসের অসংখ্য ফযীলত রয়েছে, যা মুসলিমদের জন্য এই দিনটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এর মধ্যে প্রধান কিছু ফযীলত নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. আরাফাহ দিবসের রোজা দু’বছরের গুনাহের কাফফারা
যারা হজ পালন করছেন না, তাদের জন্য আরাফাহ দিবসে রোজা রাখা অত্যন্ত সুন্নত এবং এর মাধ্যমে মহান সওয়াব লাভ করা যায়। আবু কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে আরাফাহ দিবসের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন: “এটি অতীত এবং আগামী বছরের গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত করে।” (সহীহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, একজন বিশ্বাসী যদি এই দিনে রোজা রাখে, তবে তার পূর্ববর্তী এক বছরের এবং পরবর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তবে, যারা হজ পালন করছেন, তাদের জন্য আরাফাহ দিবসে রোজা রাখা নিষেধ। এর কারণ হলো, হজযাত্রীদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে দোয়া ও ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যা রোজার কারণে দুর্বল হতে পারে।
২. আরাফাহ দিন গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দিন
আরাফাহ দিবস গুনাহ মাফ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের এক অসাধারণ সুযোগ নিয়ে আসে। সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন: “আরাফাহর দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়?”
ইবনে আব্দুল বার্র (রহঃ) বলেন, এই দিনে মুমিন বান্দারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গুনাহগারদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন না। তবে তওবা করার মাধ্যমে ক্ষমা-প্রাপ্তির পরই তা সম্ভব। এই হাদিসটি আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই দিনে বান্দার তওবা ও ইস্তিগফার আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে কবুল করেন।
৩. অধিক পরিমাণে যিকির ও দোয়া করার উপযুক্ত সময়
বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর মধ্যে আরাফাহ দিবস অন্যতম। এই দিনের দোয়া সারা বছরের মধ্যে যেকোনো দিনের দোয়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, “সবচেয়ে উত্তম দোয়া হলো আরাফাহ দিবসের দোয়া। আর সর্বশ্রেষ্ঠ কথা যা আমি বলি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বলেছেন তা হলো: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়ইন কাদির।” (তিরমিযী)
এই দোয়াটির অর্থ হলো: “আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো মা‘বূদ নেই, রাজত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য এবং তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।” ইমাম খাত্ত্বাবী (রহঃ) বলেন, এই হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, দোয়া করার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও তাঁর মহত্বের ঘোষণা করা উচিত। তাই এই দিনে বেশি বেশি যিকির ও দোয়া করা উচিত।
আরাফাহ দিবসের শ্রেষ্ঠ দোয়া
আরাফাহ দিবসের মূল আমল হলো দোয়া। এই দিনে যে দোয়াটি বিশেষভাবে পাঠ করার কথা বলা হয়েছে, তা হলো:
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়ইন কাদির।
এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ, তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতা, তাঁর প্রতি সকল প্রশংসা এবং তাঁর সর্বশক্তিমান হওয়ার ঘোষণা করা হয়। এটি এমন একটি দোয়া যা আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরে এবং বান্দার বিনয় ও নির্ভরতাকে প্রকাশ করে। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়, যা তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
দোয়া কবুলের আদব ও কায়দাসমূহ
দোয়া একটি ইবাদত। দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু আদব ও কায়দা-কানুন রয়েছে, যা অনুসরণ করলে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আরাফাহ দিবসের মতো পবিত্র দিনে এই আদবগুলো মেনে চলা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিচে দোয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব উল্লেখ করা হলো:
১. শুদ্ধ নিয়ত
দোয়া আরম্ভের সময় মনে মনে নিয়াত করবেন যে আপনি একটি মহৎ ইবাদত বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন। কেননা হাদিসে এসেছে, ‘দোয়াই ইবাদত’। মনে মনে এই ধরনের ভাবও উদ্রেক করবেন যে একমাত্র আল্লাহই সমস্ত হাজত পুরা করতে পারেন। হাজত-প্রয়োজন পুরা করা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
২. ওজু অবস্থায় দোয়া করা
যদিও ওজু ব্যতীত দোয়া করা জায়েজ, তবে যেহেতু দোয়া একটি ইবাদত, তাই ওজু অবস্থায় করাই উত্তম। ওজু অবস্থায় দোয়া করলে মন পবিত্র থাকে এবং আল্লাহর প্রতি আরও বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ হয়, যা দোয়ার গুণগত মান বৃদ্ধি করে।
৩. হাতের তালু চেহারার দিকে ফিরিয়ে দোয়া করা
হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে তোমরা যখন সওয়াল করবে, হাতের তালু দিয়ে সওয়াল করবে। হাতের পিঠ দিয়ে নয়।’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দোয়া করার সময় হাতের তালু চেহারার দিকে রাখতেন। প্রয়োজন ও হাজত প্রকাশের এটাই হলো সর্বোত্তম ধরন, যাতে একজন অভাবী ব্যক্তি পাওয়ার আশায় দাতার দিকে বিনয়াবনত হয়ে হাত বাড়িয়ে রাখে।

৪. হাত উঁচুতে ওঠানো
হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি তার হাত এতটুকু উঠায় যে, তার বগলের নীচ দৃশ্যমান হয়ে উঠে এবং আল্লাহর কাছে আর্জি পেশ করে, আল্লাহ তার আর্জি পূরণ করেন।’ (আবু দাউদ) এটি আল্লাহর কাছে চরম বিনয় ও আকুতি প্রকাশের একটি রূপ।
৫. আল্লাহর প্রশংসা ও গুণ বর্ণনার মাধ্যমে দোয়া শুরু করা
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অধিকাংশ সময় এভাবেই দোয়া করতেন। এমনকি কিয়ামতের ময়দানে আরশের কাছে সিজদায়রত হয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর প্রশংসা ও গুণ বয়ান করবেন, এরপর আল্লাহ তাঁকে সওয়াল করার অনুমতি দেবেন। এটি আল্লাহর প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়।
৬. নবী (সাঃ) এর প্রতি দরুদ পাঠ করা
হাদিসে এসেছে, ‘প্রত্যেক দোয়া নবী (সাঃ) প্রতি দরুদ না পড়া পর্যন্ত বাধাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকে।’ (তিরমিযী) তাই দোয়ার শুরুতে ও শেষে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরুদ পাঠ দোয়ার কবুলিয়াতকে ত্বরান্বিত করে।
৭. প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করা
পবিত্র কুরআনে এর কিছু উদাহরণ এসেছে, যেমন: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন ও আমার মাতাপিতাকে।” (সূরা নূহ, ৭১:২৮) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ও কারো জন্য দোয়া করলে প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করতেন। এটি বিনয় ও নিজের প্রয়োজনের প্রতি সচেতনতার প্রকাশ।
৮. দোয়া করার সময় কোনো ইতস্তত না করা
এরকম না বলা যে, হে আল্লাহ তোমার যদি ইচ্ছা হয় তাহলে দোয়া কবুল করো। যদি ইচ্ছা হয় তবে রহম করো। যদি ইচ্ছা হয় আমাকে রিজিক দাও। বরং দৃঢ়-প্রত্যয়ী হয়ে দোয়া করা। হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ যেন না বলে, হে আল্লাহ! তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো, তুমি চাইলে আমার প্রতি দয়া করো। বরং সে যেন দৃঢ়ভাবে চায়, কারণ আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।’ (বুখারী, মুসলিম)
৯. মন-মস্তিষ্ক জমিয়ে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে দোয়া করা
কেবল মুখে মুখে শব্দ উচ্চারণ করে না যাওয়া। হাদিসে এসেছে, ‘দোয়া কবুল হবে এই একীন নিয়ে আল্লাহর কাছে চাও। জেনে রাখো, আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন দোয়া কবুল করেন না যা গাফেল ও উদাসীন হৃদয় থেকে বের হয়।’ (তিরমিযী) তাই পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে দোয়া করা উচিত।
১০. একীনের সাথে দোয়া করা
আল্লাহ পাক দোয়া কবুল করার ওয়াদা করেছেন, এরশাদ হয়েছে, “(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬) ওপরে বর্ণিত হাদিসেও উল্লেখ হয়েছে যে, ‘তোমরা কবুল হওয়ার একীন নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো।’
১১. দোয়ার সময় সীমা লঙ্ঘন না করা
অর্থাৎ অতিরঞ্জিত আকারে দোয়া না করা। সা’দ (রাঃ) তাঁর এক ছেলেকে এই বলে দোয়া করতে শুনলেন যে, হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে জান্নাত চাচ্ছি। জান্নাতের সকল নেয়ামত চাচ্ছি। আমি তোমার কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাচ্ছি। জাহান্নামের শেকল ও বেড়ি সমূহ থেকে পানাহ চাচ্ছি। সা’দ (রাঃ) বলেন, হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি: “এমন সম্প্রদায় আসবে যারা তাদের দোয়ায় সীমা-লঙ্ঘন করবে।” (আবু দাউদ) সাবধান তুমি তাদের দলভুক্ত হবে না। তোমাকে যদি জান্নাত দেওয়া হয় তাহলে এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছু সমেত দেওয়া হবে। আর যদি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তাহলে জাহান্নাম ও তার মধ্যে যতো খারাপি আছে তার থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।
১২. আল্লাহর দরবারে হীনতা-দ্বীনতা ও অপারগতা প্রকাশ করা
সকল ক্ষমতা আল্লাহর হাতে। উপকার ও অপকারের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ যদি কারো কল্যাণ করতে না চান তাহলে সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষ মিলেও তার কোনো উপকার সাধন করতে পারবে না। আর যদি তিনি কারো উপকার করতে চান তাহলে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ মিলেও তা ঠেকাতে পারবে না। এ ধরনের বিশ্বাস নিয়ে নিজেকে একেবারে হীন ও দুর্বল ভেবে আল্লাহর কাছে সওয়াল করতে হবে। আল্লাহ হলেন সৃষ্টিকর্তা আর আমি অতি নগণ্য, অনুল্লেখযোগ্য একজন দাস, বান্দা। আল্লাহ হলেন ধনী আমি গরিব, অক্ষম। তিনি পবিত্র ও সকল অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত। আর আমি আদ্যোপান্ত অসম্পূর্ণ। একমাত্র তিনিই বিধান দাতা আমি বিধান গ্রহীতা। এ ধরনের মন-মানসিকতা নিয়ে দোয়া করতে হবে।
১৩. পরিব্যাপ্ত ও নবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা
কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তা পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত, ‘জামে’। এক বর্ণনায় এসেছে, ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পরিব্যাপ্ত দোয়া পছন্দ করতেন, ও অন্যগুলো ছেড়ে দিতেন।’ (আবু দাউদ) এই দোয়াগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও এর অর্থ ব্যাপক ও গভীর।
১৪. পরিত্রাণ পাওয়ার দোয়া অধিক পরিমাণে করা
কেননা দুনিয়া ও আখিরাতে যে ব্যক্তি পরিত্রাণ পেয়ে গেল তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ হতে পারে না। হাদিসে এসেছে, ‘পরিত্রাণের দোয়া বেশি, বেশি করো।’ (তিরমিযী) এটি দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৫. দোয়া কবুলের জন্য মাধ্যম হিসেবে কিছু পেশ করা
যেমন আল্লাহর নাম ও সিফাত-গুণাবলীর উসিলায় দোয়া তলব করা। এরশাদ হয়েছে, “আল্লাহর আছে সুন্দর নাম-সমগ্র, সেগুলো দিয়ে তাঁকে ডাকো।” (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৮০) দোয়া করার সময় বেশি বেশি ‘ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ বলা। হাদিসে এসেছে, ‘(তোমাদের দোয়ায়) বেশি বেশি ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম বলো।’ (তিরমিযী) কোনো ব্যক্তিকে উসিলা বানিয়ে দোয়া করা কখনো উচিত নয়, বরং আল্লাহর গুণাবলী ও তাঁর নেক আমলের উসিলা গ্রহণ করা উচিত।
১৬. ইসমে আজম দিয়ে দোয়া করা
এক বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এক ব্যক্তিকে এই বলে দোয়া করতে শুনলেন যে, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সওয়াল করছি (এই একীন নিয়ে) যে আপনি আল্লাহ, অদ্বিতীয় ও অমুখাপেক্ষী। কাউকে জন্ম দেননি, কারও থেকে জন্ম গ্রহণও করেননি। আর তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘লোকটি আল্লাহর ইসমে আজম দিয়ে সওয়াল করেছে। যার দ্বারা সওয়াল করলে আল্লাহ দান করেন, দোয়া করলে কবুল করেন।’ (আবু দাউদ, তিরমিযী)
১৭. বেশি বেশি চাওয়া এবং অতিমাত্রায় অনুনয়-বিনয় করা
হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ যখন সওয়াল করবে সে যেন বেশি মাত্রায় করে। কেননা সে আল্লাহর কাছে সওয়াল করছে।’ (ইবনে হিব্বান) আল্লাহর কাছে চাইতে কোনো লজ্জা বা সংকোচ থাকা উচিত নয়, বরং পূর্ণ আস্থা ও বিনয়ের সাথে চাইতে হবে।
১৮. কেবলামুখী হয়ে দোয়া করা
কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কেবলামুখী হয়ে দোয়া করতেন। (বুখারী, মুসলিম) কেবলামুখী হয়ে দোয়া করা দোয়ার আদবের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মাধ্যমে দোয়ায় আরও বেশি বরকত আসে।
১৯. দোয়া শেষ হলে ‘আমীন’ বলা
দোয়া শেষ করার পর ‘আমীন’ বলা সুন্নত। ‘আমীন’ অর্থ হলো, ‘হে আল্লাহ, কবুল করুন।’ এর মাধ্যমে দোয়ার সমাপ্তি ঘটে এবং আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার জন্য প্রার্থনা করা হয়।
উপসংহার
আরাফাহ দিবস মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার। এই দিনে ইবাদত, রোজা, যিকির এবং বিশেষ করে দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং নিজেদের পাপ মোচন করে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে পারে। আরাফাহ দিবসের দোয়া কবুলের সম্ভাবনা অনেক বেশি, তাই উপরোক্ত আদবসমূহ মেনে চলে আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। এই পবিত্র দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন নিজেদের আত্মিক উন্নতি সাধন করতে পারি এবং আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভে ধন্য হতে পারি, সেই কামনাই করি।
{}আরাফাহ দিবস ইসলামের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা জিলহজ মাসের ৯ তারিখে পালিত হয়। এই দিনে রোজা রাখা, দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে বান্দা অশেষ সওয়াব ও মুক্তি লাভ করতে পারে।https://varamama.com/arafah-diboser-fojilot-shreshtho-doa-amol/
0 মন্তব্যসমূহ