আশুরার রোজা: মহররম মাসে কয়টি রোজা রাখা উত্তম ও এর ফজিলত

ইসলামিক শিক্ষা, আশুরার রোজা, ইসলামিক রোজা, কারবালা, ফজিলত, মহররম, মুসা (আ.), সুন্নাহ

ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এই মাসটি মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ। মহররমের দশম দিনকে ‘আশুরা’ বলা হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। আশুরার দিন রোজা রাখা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন করেন, আশুরার রোজা কয়টি রাখা উচিত এবং এর সঠিক নিয়ম কী?

আশুরার রোজার গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আশুরার দিনটি কেবল একটি সাধারণ দিন নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে নবী-রাসূলদের (আ.) সংগ্রাম ও বিজয়ের বহু স্মৃতি। এই দিনের রোজা রাখার বিধান প্রবর্তন করেছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা:)।

মুসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা

আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, আল্লাহ তায়ালা এই দিনে নবী মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন। ফেরাউন ও তার বিশাল সৈন্যবাহিনীকে নীল নদে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল। এই বিজয়ের শুকরিয়া আদায় করে মুসা (আ.) আশুরার দিন রোজা রাখতেন। মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন জানতে পারলেন যে, ইহুদিরাও এই দিনে রোজা রাখে, তখন তিনি বললেন, “মুসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা

আশুরার দিনটি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার জন্যও স্মরণীয়। ৬১ হিজরির এই দিনে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। যদিও আশুরার রোজা রাখার বিধান কারবালার ঘটনার অনেক পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তবুও এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য শোক ও ত্যাগের এক প্রতীক হয়ে আছে। তবে, আশুরার রোজার মূল কারণ কারবালার ঘটনা নয়, বরং মুসা (আ.)-এর বিজয় ও রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সুন্নাহ।

আশুরার রোজা কয়টি: রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর নির্দেশনা

আশুরার রোজা কয়টি রাখা উচিত, এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মূলত, ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য পরিহার করার জন্য তিনি একটির পরিবর্তে দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য পরিহার

রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি তাদের রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে তারা জানায় যে, এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন, তাই তারা শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, “মুসা (আ.)-এর ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” এরপর তিনি আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দেন। তবে, ইহুদিদের সাথে যেন পুরোপুরি সাদৃশ্য না হয়, সেজন্য তিনি একটি অতিরিক্ত রোজা রাখার পরামর্শ দেন।

বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,

“তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে যেন মিল না হয় সেজন্য মহররমের ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরো একটি রোজা রাখ।” (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)

আশুরার রোজা: মহররম মাসে কয়টি রোজা রাখা উত্তম ও এর ফজিলত

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আশুরার দিন (মহররমের ১০ তারিখ) একটি রোজা এবং এর আগের দিন (৯ তারিখ) অথবা পরের দিন (১১ তারিখ) আরেকটি রোজা সহ মোট দুটি রোজা রাখা উচিত।

কয়টি রোজা রাখা উত্তম: ৯, ১০ ও ১১ মহররম

আশুরার রোজা কয়টি রাখা উত্তম, এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে, যা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর বিভিন্ন হাদিসের আলোকে গঠিত।

  • ৯ ও ১০ মহররম (তাসুআ ও আশুরা): এটি সবচেয়ে উত্তম ও পছন্দনীয় পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই ৯ তারিখে রোজা রাখব।” (সহীহ মুসলিম)। এর মাধ্যমে ইহুদিদের সাথে পুরোপুরি পার্থক্য করা হয়। ৯ তারিখের রোজাটিকে ‘তাসুআ’ বলা হয়।
  • ১০ ও ১১ মহররম (আশুরা ও পরের দিন): এটিও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। যদি কোনো কারণে ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তবে ১০ ও ১১ তারিখে রোজা রাখা যেতে পারে। এটিও ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য পরিহারের উদ্দেশ্য পূরণ করে।
  • ৯, ১০ ও ১১ মহররম (তিনটি রোজা): কিছু আলেম তিনটি রোজা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন, যেন কোনোভাবেই আশুরার রোজা ছুটে না যায় এবং ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য না হয়। এটি অধিক সতর্কতা ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে করা যেতে পারে।
  • শুধুমাত্র ১০ মহররম: শুধুমাত্র ১০ মহররমের রোজা রাখা জায়েজ, তবে অনেক আলেম এটিকে মাকরুহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন, কারণ এতে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে, যদি কেউ শুধুমাত্র ১০ তারিখে রোজা রাখে, তার রোজা সহীহ হবে এবং সে সওয়াব পাবে, ইনশাআল্লাহ।

অতএব, সবচেয়ে উত্তম হলো ৯ ও ১০ মহররম দুটি রোজা রাখা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা।

আশুরার রোজার ফজিলত

আশুরার রোজার ফজিলত অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা:) এই রোজার বিশেষ সওয়াবের কথা উল্লেখ করেছেন।

  • এক বছরের গুনাহ মাফ: রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।” (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)। এটি এক বিশাল প্রাপ্তি, যা মুসলিমদের এই রোজার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
  • নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ: আশুরার রোজা রাখা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। সুন্নাহ অনুসরণ করে আমল করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।
  • আল্লাহর শুকরিয়া আদায়: মুসা (আ.)-এর বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

আশুরার দিনে অন্যান্য আমল

আশুরার দিনে রোজা রাখার পাশাপাশি আরও কিছু আমল করা যেতে পারে, যা সওয়াবের কারণ হতে পারে। তবে, এই দিনে কোনো বিশেষ ইবাদত বা নির্দিষ্ট পদ্ধতির আমল রাসূলুল্লাহ (সা:) থেকে প্রমাণিত নয়।

  • নফল নামাজ: অন্যান্য দিনের মতোই নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে।
  • কুরআন তিলাওয়াত: পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা।
  • জিকির ও দোয়া: বেশি বেশি জিকির ও দোয়া করা।
  • দান-সদকা: অভাবী ও দুস্থদের মাঝে দান-সদকা করা। যদিও আশুরার দিনে দান-সদকার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো সহীহ হাদিস নেই, তবে সাধারণভাবে দান-সদকা সব সময়ই সওয়াবের কাজ।
  • তওবা ও ইস্তিগফার: নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

তবে, আশুরাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার ও বিদআত থেকে বিরত থাকা জরুরি। যেমন: শোক মিছিল, মাতম, তাজিয়া তৈরি, বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করে তা বাধ্যতামূলক মনে করা ইত্যাদি। এসব কাজ ইসলাম সমর্থন করে না। আশুরার মূল উদ্দেশ্য হলো রোজা রাখা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।

উপসংহার

মহররম মাসের আশুরার রোজা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য পরিহার করে মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ দুটি রোজা রাখা উত্তম। এই রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আসুন, আমরা আশুরার এই পবিত্র দিনে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে রোজা রাখি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করি।

{}আশুরার রোজা মহররম মাসের ১০ তারিখে রাখা হয়, তবে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য পরিহারের জন্য এর সাথে ৯ তারিখ অথবা ১১ তারিখের রোজা মিলিয়ে মোট দুটি রোজা রাখা উত্তম। এই রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয় এবং এটি মুসা (আ.)-এর বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ।https://varamama.com/ashurar-roza-koyti-rakha-uttam-fajilot/

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ